শ্রাদ্ধ-বাসরে প্রধান আরাধ্য-দেবতার বর্ণনাসহ শ্রাদ্ধ-বাসরে ব্রহ্ম-ভুজ্যি/ভুরি ভোজনের ব্যাখ্যা, নিরামিষ বা আমিষ আহার প্রসঙ্গে


যেহেতু শ্রাদ্ধকার্য্যটি পিতৃলোকের উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকেতাই শ্রাদ্ধ-বাসরে প্রধান আরাধ্য-দেবতা হলেন পিতৃলোকের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা অর্য্যমা । (বেদরূপ গাভীর দুগ্ধস্বরূপ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-র ১০ম অধ্যায় বিভুতিযোগে শ্রীভগবানের উক্তি)  আর এই অর্য্যমা হলেন স্বয়ং শ্রীভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিভুতি  অর্থাৎ মূলতঃ শ্রীকৃষ্ণই প্রধান আরাধ্য দেবতা  
যেহেতু শাস্ত্র-বচন অনুসারে সর্ব্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’ অর্থাৎ সবকিছুতেই ব্রহ্ম বিরাজিতসেহেতু শ্রাদ্ধ-বাসরে মানুষ থেকে শুরু করে যে কোন প্রাণীকেও শ্রদ্ধার সাথে ভোজন করানো হলেও ব্রহ্ম-ভুজ্যি নিষ্পাদিত হয়  আর তাছাড়া যারা ব্রহ্ম-ভুজ্যি বলতে ব্রাহ্মণকে ভোজন করানো বুঝেনতাদের উচিত মনু-সংহিতার দিকে নজর দেওয়া  কারণ মনু বলেছেন, - দৈবকার্যে দুই ও পিতৃকার্যে তিন জন ব্রাহ্মণ অথবা দেবপক্ষে এক ও পিত্রাদিপক্ষে এক জন ব্রাহ্মণ ভোজন করাতে হয়  সমৃদ্ধিশালী হলেও ইহা অপেক্ষা বিস্তর ব্রাহ্মণ-ভোজনে প্রসক্ত হবে না  ব্রাহ্মণবাহুল্য হলে তাঁদের সেবাদেশকালশুদ্ধাশুদ্ধি এবং পাত্রাপাত্র বিচার - এই পাঁচটি সম্বন্ধে কোন নিয়ম থাকে না  এ কারণব্রাহ্মণবাহুল্য করতে চেষ্টা করা উচিত নয় । (৩/১২৫ ও ১২৬)
পূজ্যতম বেদাধ্যায়ী ব্রাহ্মণকে দেব-পিত্রসম্বন্ধীয় হব্য-কব্যাদি অন্নসকল প্রধান করা দাতাদের উচিত  এরূপ ব্রাহ্মণে দান করলে মহাফল জন্মে  দ্বিজ, - দৈব এবং পিতৃকার্যে এক একটি বেদবিৎ ব্রাহ্মণ ভোজন করাবেন  এতেও তাহার পুষ্টতর ফললাভ হবে  কিন্তু বেদানভিজ্ঞ বহু ব্রাহ্মণকে ভোজন করালেও কোন ফল নেই  বেদপারগ ব্রাহ্মণের অতিদুর পর্যন্ত অনুসন্ধান নিবে অর্থাৎ তাঁহার পিতা পিতামহাদি পূর্ব্বপুরুষগণেরও কিরূপ আভিজাত্যাদি গুণতাহা নিরূপণ করিবে  এইরূপ বংশপরম্পরা শুদ্ধ বেদপারগ ব্রাহ্মণ হব্য-কব্য বহনে তীর্থস্বরূপ  এইরূপ ব্রাহ্মণকে দান করলে অতিথিকে দানের ন্যায় মহাফল প্রাপ্ত হওয়া যায় । (৩/১২৮-১৩০)
জ্ঞানোৎকৃষ্ট ব্রাহ্মণকেই হব্য-কব্য প্রদান করা উচিত  রক্তাক্ত হস্ত রক্ত দ্বারা প্রক্ষালিত হলে কখনো শুদ্ধ হয় না  অর্থ এই যেমূর্খ পাপী লোকদেরকে ভোজন করিয়ে পাপীর পাপ কখনো বিদুরিত হয় না  অজ্ঞ ব্রাহ্মণ হব্য-কব্যে যে কয়েকটি গ্রাস ভোজন করেনমৃত হলে পর পরলোকে তাঁহাকে এবং শ্রাদ্ধকর্ত্তাকে ততগুলি উত্তপ্ত লৌহপিণ্ড ভোজন করতে হয়  দ্বিজগণের মধ্যে কেহ কেহ আত্ম-জ্ঞাননিষ্ঠকেহ কেহ তপস্যা-পরায়ণকেহ কেহ বা তপস্যা ও অধ্যয়ণ উভয়নিষ্ঠ এবং আর কতকগুলি কর্মনিষ্ঠ  ইহার মধ্যে পিতৃলোকের উদ্দেশ্যে যে কব্যতাহা আত্ম-জ্ঞাননিষ্ঠ ব্রাহ্মণেই যত্নপূর্ব্বক স্থাপন করতে হয় কিন্তু দেবসম্বন্ধীয় হব্যসকল যথান্যায় ঐ চারপ্রকার ব্রাহ্মণকেই দেওয়া যেতে পারে  যাঁহার পিতা মূর্খকিন্তু যিনি স্বয়ং বেদপারগ অথবা যিনি নিজে মূর্খ কিন্তু পিতা বেদপারগ - এই দুই জনের মধ্যে যাঁহার পিতা বেদপারগতাঁহাকেই শ্রাদ্ধে প্রশস্ততর পাত্র বলে জানবেকিন্তু বেদমর্যাদার জন্য ইতর অর্থাৎ অশ্রোত্রিয়-পিতৃক বেদজ্ঞও সৎকারার্হ  বেদপারগ পিতার পুত্র বিশিষ্ট সংস্কারবান্ - এই হেতু তাঁহার পাত্রত্ব অধিক  শ্রাদ্ধকার্যে মিত্রতা-নিবন্ধন ভোজন করাবে না ধনান্তর বা কারণান্তর দ্বারা মিত্রের প্রতি মিত্রতা প্রদর্শন করা উচিত   কিন্তু যিনি শত্রুও নন, মিত্রও নন, এমন ব্রাহ্মণকেই শ্রাদ্ধে ভোজন করানো কর্তব্য যাহার শ্রাদ্ধ অথবা দৈবকার্য মিত্রপ্রধান অর্থাৎ প্রধানত যাহার শ্রাদ্ধাদিতে মিত্রগণই ভোজন করেন, তাহার সেই কার্যে পারলৌকিক কোন ফল নেই যে মনুষ্য মোহবশতঃ শ্রাদ্ধকার্য দ্বারা মিত্রতা সম্পাদন করতে চায়, শ্রাদ্ধমিত্র সেই দ্বিজাধম কখনো স্বর্গলাভের অধিকারী হয় না দ্বিজগণ-কর্তৃক মিত্রতা-সাধন যে গোষ্ঠীভোজন, উহাকে ঋষিরা পিশাচধর্ম বলে থাকেন । (৩/১৩২-১৪১)
লবণাক্ত ভুমিতে বীজ বপন করে বপনকারী যেমন কোন ফল লাভ করে না, তদ্রূপ অবিদ্বান ব্রাহ্মণকে হবি দান করে দাতা কোন ফল পান না পরন্তু বিদ্বান-ব্রাহ্মণকে বিধিবৎ দক্ষিণা দান করলে দাতা ও প্রতিগ্রহীতা - উভয়ে ইহ পর - উভয় লোকেই ফলভাগী হন শত্রু যদি অতি বিদ্বানও হন, তাহাকে ভোজন করানো কোন ক্রমেই বিধেয় নহে শত্রুলোকে শ্রাদ্ধীয় দ্রব্য ভোজন করলে পরলোকের পক্ষে উহা একেবারে নিস্ফল শ্রাদ্ধে অতি যত্নের সাথে বেদপারগ ঋগ্বেদী ব্রাহ্মণকে অথবা সমুদায় শাখাধ্যায়ী যজুর্বেদী ব্রাহ্মণকে কিন্তু সমাপ্তাধ্যায় সামবেদী ব্রাহ্মণকে ভোজন করাবে এই তিন ব্রাহ্মণের একজনও যাহার শ্রাদ্ধে অর্চিত হয়ে ভোজন করেন, তাহার পিত্রাদি সপ্ত পুরুষের চিরস্থায়িনী তৃপ্তি লাভ হয় হব্য-কব্য প্রদানে পূর্বোক্ত শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণগণই মূখ্যকল্প জানবে তদভাবে সাধুজনানুষ্ঠিত বক্ষ্যমান অনুকল্প বিধি এই যে, মাতামহ, মাতুল, ভাগিনেয়, শ্বশুর, গুরু, দৌহিত্র, জামাতা, মাতৃস্বসৃ-পিতৃস্বসৃপুত্রাদি. পুরোহিত ও শিষ্য - তাদেরকে ভোজন করাবে ধর্মজ্ঞ ব্যক্তি দৈব-ক্রিয়ায় ভোজনীয় ব্রাহ্মণগণের তত পরীক্ষা করবেন না, কিন্তু পিতৃকার্যে তাঁদেরকে যত্নের সাথে পরীক্ষা করবেন যে সকল ব্রাহ্মণ চুরি করে, যাহারা পতিত, যাহারা ক্লীব, যাহারা নাস্তিকবৃত্তি-অবলম্বী, বেদাধ্যয়ণশূণ্য ব্রহ্মচারী, চর্মরোগগ্রস্ত, দ্যুতক্রীড়াপরায়ণ, বহুযাজনশীল ব্রাহ্মণ, চিকিৎসক ব্রাহ্মণ, প্রতিমা-পরিচারক দেবল ব্রাহ্মণ, মাংসবিক্রয়ী এবং যে সকল ব্রাহ্মণ নিন্দিত-বাণিজ্য দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে, গ্রামের বা রাজার সরকারী ভৃত্য, কুৎসিত নখরোগ-বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ, কৃষ্ণবর্ণ-দন্ত-বিশিষ্ট, গুরুর প্রতিকুলাচরণকারী, শ্রৌত স্মার্ত্ত অগ্নি পরিত্যাগকারী, কুসীদজীবী, যক্ষ্মারোগী, জীবিকার জন্য ছাগ গো প্রভৃতি পশুপালক, পরিবেত্তা, পঞ্চমহাযজ্ঞানুষ্ঠান-রহিত, ব্রাহ্মণদ্বেষী, পরিবিত্তি এবং গণার্থ অর্থাৎ সাধারণের জন্য উৎকৃষ্ঠ মঠ বা ধনাদিজীবী, যে সকল ব্রাহ্মণ নর্তন বা গায়নাদি বৃত্তি দ্বারা জীবীকা নির্বাহ করে, যে ব্রহ্মচারী বা যতি স্ত্রী-সম্পর্ক দ্বারা ব্রহ্মচর্য নষ্ট করেছেন, যিনি সবর্ণা বিবাহ না করে শূদ্রাকে বিবাহ করেছেন, পুনর্ভুপুত্র, কাণ ও যাহার জায়ার উপপতি আছে, যিনি বেতন নিয়ে বেদ অধ্যাপনা করেন সেই অধ্যাপক, যে শিষ্য তাদৃশ গুরুর নিকট হতে বেদ অধ্যয়ণ করেন, যিনি শূদ্রশিষ্য, যিনি শূদ্রকে অধ্যয়ন করান, যে সর্বদা নিষ্ঠুরভাষী, যে কুণ্ড অর্থাৎ স্বামী বর্তমানে জারজ সন্তান, যে গোলক অর্থাৎ স্বামীর মরণের পর জারজসন্তান, যে ব্রাহ্মণ পিতা-মাতা বা গুরুগণকে অকারণে পরিত্যাগ করেছে, যে পতিত লোকের সাথে অধ্যয়ন ও কন্যাদানাদি সম্বন্ধ দ্বারা মিলিত হয়েছে, যে ব্রাহ্মণ গৃহদাহ করে, যে ব্রাহ্মণ লোকের প্রাণনাশের জন্য বিষ প্রদান করে, যে ব্রাহ্মণ কুণ্ড-গোলকের অন্ন গ্রহণ করে, যে সোমলতা বিক্রয় করে, যে সমুদ্রযাত্রা করে, যে স্তুতিবাদ দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে, তৈলের জন্য যে তিলাদি বীজ পেষণ করে, যে তুলামান বা লেখ্যাদিবিষয় সকল জাল করে, যে পিতার সাথে বিবাদ করে, যে নিজে দ্যুত ক্রীড়া জনে না - কিন্তু অর্থ দিয়ে পরের দ্বারা খেলায়, যে ব্রাহ্মণ মদ্যপায়ী, যে পাপরোগী, যে অপবাদযুক্ত, যে ব্রাহ্মণ ছদ্মবেশে অধর্মকারী, যে ইক্ষু প্রভৃতির রস বিক্রয় করে, যে ব্রাহ্মণ ধনুক ও শর নির্মাণ করে, জ্যেষ্ঠা ভগ্নীর বিয়ে না হতে যে কনিষ্ঠা ভগ্নীর বিয়ে হয় - তাহার পতি, যে মিত্রের অপকার করে, যে দ্যুত দ্বারা জীবিকা করে, এবং যে পুত্রের নিকট বেদশাস্ত্রে শিক্ষিত, যাহার অপস্মার রোগ আছে, যাহার গণ্ডমালা আছে, যাহার শ্বেত কুষ্ঠ আছে, যে ব্যক্তি দুর্জন, উন্মত্ত, অন্ধ বা বেদনিন্দুক, যে ব্রাহ্মণ হাতি, গরু, ঘোড়া ও উটের ধমক অর্থাৎ উহাদের দমন বা শিক্ষা দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে, নক্ষত্রাদি গণনা করা যাহার উপজীবিকা, যে পক্ষিপোষণ দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে, যে ব্রাহ্মণ যুদ্ধের আচার্য, যে ব্রাহ্মণ সেতু-ভেদাদি দ্বারা প্রবহমান স্রোতের গতি পরিবর্তন করে অথবা সেই স্রোতের অবরোধ করে, যে বাস্তুবিদ্যাজীবী অর্থাৎ জীবিকার জন্য বাটী-নির্মাণাদি করে, যে দৌত্যকর্ম করে, যে বেতন-ভোগী হয়ে বৃক্ষ রোপণ করে, যে ব্রাহ্মণ খেলা দেখাবার জন্য কুকুর পোষণ করে, যে শ্যেনপক্ষীর ক্রয়-বিক্রয়াদি দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে, যে কন্যকা গমন করে, যে হিংসা-বৃত্তি করে, যে শূদ্রসেবাদি দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে, যে নানাজাতীয় লোকের যাজক, যে ব্রাহ্মণ আচারহীন ধর্মকার্যে নিরুৎসাহ, যে সর্বদা যাচ্ঞা দ্বারা অপরের বিরক্তি জন্মায়, যে স্বয়ংকৃত কৃষি দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে, ব্যাধির দ্বারা যাহার চরণ স্থূল হয়েছে, যে সাধুদের নিন্দিত, যে ব্রাহ্মণ মেষ ও মহিষ দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে, যে পরপূর্বাপতি অর্থাৎ একবার বিয়ে হয়েছে এমন স্ত্রীর স্বামী, যে ধন গ্রহণ করে শবের নির্হার কার্য অর্থাৎ বহনাদি করে, এই সকল লোককে যত্ন পূর্বক হব্য-কব্য হতে পরিবর্জন করবে । এই সকল নিন্দিতাচারী পংক্তি প্রবেশের অযোগ্য দ্বিজাধমদেরকে দ্বিজপ্রবর বিদ্বান ব্রাহ্মণগণ দৈব ও পৈত্র্য উভয় কার্যেই পরিত্যাগ করিবেন । তৃণের অগ্নি যেমন শীঘ্র উপশম হয়ে যায়, বেদাধ্যয়ন শূণ্য ব্রাহ্মণও তদ্রূপ হীনতেজ হয়, তাদৃশ ব্রাহ্মণকে হব্যাদি দান করা উচিত নয় , বস্তুত ভস্মে কেহই ঘৃতাহুতি প্রদান করে না । (৩/১৪২-১৬৮)
(পরবর্তী অংশ অপর পৃষ্ঠাতে)

Comments

Popular posts from this blog

সর্ববর্ণে দশাশৌচ

শ্রাদ্ধ-বাসরে প্রধান আরাধ্য-দেবতার বর্ণনাসহ শ্রাদ্ধ-বাসরে ব্রহ্ম-ভুজ্যি/ভুরি ভোজনের ব্যাখ্যা, নিরামিষ বা আমিষ আহার প্রসঙ্গে - ৩